করোনাভাইরাস পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিন, দুটোতেই বাংলাদেশের বেহাল অবস্থা। ৭ মার্চ থেকে ২২ মার্চ- এই ১৫ দিনে বিদেশ থেকে এসেছেন এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। কোয়ারেন্টিনে তাদের ১৭ হাজার। পরীক্ষা হয়েছে ৪৬৯ জনের। করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষার জন্য ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য বিভাগে মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি আজো নেই। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা কবে চালু হবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের হুঙ্কার ছেড়েছেনÑ ‘করোনাকে আমরা থোড়াই কেয়ার করি। আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী।’ আরেকটি বড় দল বিএনপি বলেছে, আওয়ামী লীগ করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর? এসব রাজনৈতিক বাক্যবাণ বৈশ্বিক মহামারীতে আক্রান্ত লাখ লাখ মানুষের সাথে তামাশা করার শামিল। বিশ্বের ১৭০টি দেশ জীবন বাজি রেখে কাজ করছে করোনার মোকাবেলায়। অন্য দিকে আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা নির্বাচন এবং একে অপরের বিরুদ্ধে গালমন্দ করছেন। আসলেই নির্বাচিত সরকার হলে এমন কাজ করা সম্ভব হতো না।

বিগত সাত দিনের পত্রপত্রিকার পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের ১৭০টি রাষ্ট্রে কতটা আক্রমণ করেছে। এ পর্যন্ত (২১ মার্চ ২০২০) বাংলাদেশের পরিস্থিতি মোট আক্রান্ত ২৪ জন মৃত্যু দু’জন, চীনসহ আক্রান্ত দেশ ও অঞ্চল ১৭০, মোট মৃত্যু ১২ হাজার ৭৫৫, মোট আক্রান্ত দুই লাখ ৯৭ হাজার ৯০+, ইতালিতে মোট মৃত্যু চার হাজার ৮২৫, মোট আক্রান্ত পাঁচ হাজার ৩৫৭। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ছয়টি এলাকার ৭৮ হাজার মানুষ এখন স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলার ১৬টি স্থানে ২৪ ঘণ্টা মোতায়েন রয়েছে ‘কয়েক শ’ পুলিশ। পুরো মাদারীপুরের মানুষ এখন উৎকণ্ঠায়। জেলার তিন হাজার প্রবাসীর মধ্যে ৬৮৪ জন ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিবচরে এসেছেন। হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন ২৭০ জন।

সরকার বলছে, এটা কোনো রোগ নয়Ñ সেহেতু আতঙ্কিত হবেন না। আমাদের এক বছরের খাদ্য মজুদ আছে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে। সরকারের দায়িত্বশীল মহল যদি এসব কথা বলে, তা হলে সাধারণ মানুষ কার ওপর নির্ভর করবে (প্রথম আলো-২২ মার্চ ২০২০)। করোনাভাইরাস চীনকে আক্রান্ত করেছে, ইউরোপ লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকেও গ্রাস করেছে। বিশ্ববাসী করোনাভাইরাসের কাছে অসহায়। আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তেগফার ছাড়া এ মুহূর্তে মানুষের কিছুই করার নেই। সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি। করোনা নিয়ে সিপিডি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, ২০২০ সালে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা এক লাখ কোটি টাকা। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আইএমএফের পূর্বাভাস প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেন, বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেয়া এ ভাইরাসের কারণে কমবে এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। রফতানি ছাড়াও ভাটার টান দেখা যাবে প্রবাসী আয় ও রাজস্ব আদায়ে। উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি কমার শঙ্কাও বাড়ছে। আমরা যেসব দেশের সাথে আমদানি-রফতানি করি তাদের সবাই করোনায় আক্রান্ত। সেহেতু অর্থনৈতিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের প্রতিবেদন তুলে ধরে তিনি বলেন, তৈরী পোশাক শিল্পে এখনই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিছু দিনের মধ্যে আমাদের রেমিট্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। বহির্বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক লোক চলে এসেছেন। তারা ওই সব দেশে আবার যেতে পারবেন কি নাÑ নিশ্চিত করে বলা যায় না। করোনাভাইরাস বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছে। সবাই নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবছেন।

বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় ডাল, মাছ, মুরগি, তেল, রসুন প্রভৃরি ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রেও সরবরাহজনিত সমস্যা। ২২ মার্চ একটি পত্রিকার লিড নিউজ ছিলÑ বড় হচ্ছে ক্ষতির অঙ্ক; করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে একের পর এক রুট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শনিবার (২১ মার্চ) থেকে কেবল হংকং, থাইল্যান্ড, চীন ও যুক্তরাজ্যের সাথে আকাশপথে যোগাযোগ চালু আছে। এর প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ রুটেও। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রী ৭২ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এ কারণে গত এক সপ্তাহে বিমান অভ্যন্তরীণ রুটে ৪০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রতিদিন ফ্লাইট ছিল ১৪২টি। যাত্রী সঙ্কটে গত এক সপ্তাহে বিমান অভ্যন্তরীণ রুটে ৪০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। বাকি তিনটি বিমান সংস্থা জানায়, অভ্যন্তরীণ রুটে ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী কমেছে। এসব রুটে এই চারটি এয়ারলাইন্স বছরে টিকিট বিক্রি থেকে আয় করে সাড়ে আট শ’ কোটি টাকা।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস কেবল মৃত্যুর সংখ্যাই বাড়াচ্ছে না, ক্ষতি ডেকে এনেছে অর্থনীতিতেও। সবচেয়ে বড় ক্ষতি চীনের, এরপর ইতালির। ইউরোপ মহাদেশের প্রায় সব দেশই অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়বে। সমস্যায় পড়বে অন্যান্য দেশও। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রধানরা বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে চিন্তিত। বিশ্বের গোটা অর্থনীতি হ-য-ব-র-ল হয়ে যাচ্ছে। এই রোগ প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রেই ব্যয় হবে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। অন্য দিকে বাংলাদেশের অবস্থা কেমন সেটা নিত্যদিনের বাজারব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলে অনুধাবন করা সম্ভব। ২২ মার্চ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় লিখেছেÑ মোটা চালের দাম ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, ডিম ও গোশতের দামও বাড়তি, বিপাকে সীমিত আয়ের মানুষ। ঢাকায় মিরপুরের একটি বাজারে দিন দশেক আগে মোটা চালের দাম ছিল ৩২ টাকা, ২১ মার্চ সেই চাল ৪০ টাকা। মাত্র ১০ দিনে শুধু চালের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে।’

সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসাবে বাজারে, (২১ মার্চ) মোটা চালের কেজি ৩৮ থেকে ৫২ টাকা। ১১ মার্চ এ দর ছিল ৩২ থেকে ৩৮ টাকা। দাম বেড়েছে ২৬ শতাংশ। সব ধরনের চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যেকোনো একটি দুর্যোগ এলে চাল বিক্রেতারা প্রথমেই চালের দাম বাড়িয়ে দেন। রাষ্ট্র দীর্ঘ ৪৮ বছরেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বলেই আমরা বারবার ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে বাজারের ঊর্ধ্বগতি প্রবণতা শুরু হয় ৮ মার্চ থেকে। এ দিন দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার তথ্য সরকার জানায়। অথচ চীন, ইতালি, স্পেন, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশে মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, ডিম, আলুসহ প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম ৮ থেকে ১২ টাকা বেড়েছে। আমরা যাকে জাহিলিয়াতের যুগ এবং মধ্যযুগ বলি, সেই দিনগুলোতেও বাজারদর এতটা বৃদ্ধি পায়নি। মানুষের কষ্টকে জিম্মি করে যারা জিনিসের দাম বাড়ায়, তারা মূলত অমানুষ।

কমেন্ট করুন