বিশ্বের ১৮৭টি দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস উৎপত্তিস্থল চীনে টানা ৩ দিন স্থিতিশীল রয়েছে। চিকিৎসকদের বীরত্বপূর্ণ সেবায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় এশিয়ার দেশটি। 

তবে থামছেই না ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল। প্রকোপ দেখা দেবার আগে লকডাউন করেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেলনা উগান্ডা। রোববার প্রথমবারের মতো আফ্রিকার দেশটিতে একজনের শরীরের মিলেছে ভাইরাসটির সংক্রমণ।

আর চীনের পরে সবচেয়ে ভয়াবহতা অবস্থা ইতালির। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রতিদিনই সেখানে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। থেমে নেই যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স, ইরানসহ অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোও।

গত ২৪ ঘণ্টায় মহামারি রূপ পাওয়া ভাইরাসটিতে বিশ্বব্যাপী নতুন করে অন্তত ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে গত ডিসেম্বরে শুরু হওয়া ভাইরাসটির প্রকোপে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪৮১ জন। যাদের বড় একটি অংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন প্রায় ৯৬ হাজার ২২৯ জন।

আক্রান্তদের প্রাণ গেছে আরও ১ হাজার ৫৯১ জনের। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ৫৯১ জনে পৌঁছেছে। যেখানে চীনকে ছাড়িয়েছে ইতালি।

আজ সোমবার চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের বরাত দিয়ে কাতার চীনা সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।

আক্রান্ত ও প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইউরোপের দেশ ইতালিতে। যেখানে শনিবার ৮০০ জনের প্রাণহানি ঘটনার পর নতুন করে ৬৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭৬ জনে।

নতুন করে ৫ হাজার ৫৮০ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এতে করে বর্তমানে ইতালিতে মোট আক্রান্ত ৫৯ হাজার ১৩৮ জন। তবে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ছয় হাজার অন্তত ১০০ জন। প্রাণ হারাদের মধ্যে ১৮ জন চিকিৎসকও রয়েছেন।

ইতালির পরই আক্রান্তের দিক থেকে এবার স্পেনকেও ছাড়িয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় এক লাফে ১০ হাজার ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩২ হাজার ৫৭ জন, যেখানে নতুন করে ১২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪শ জনে দাঁড়িয়েছে।

এরপরই ইউরোপের দেশ স্পেন। দেশটিতে বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ৫৭২ জন। প্রাণহানি ঘটেছে আরও ৪৩০ জনের। এ নিয়ে সেখানে মারা মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৭৫৬ জনের।

এদিকে জার্মানিতে গত শনিবার আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও গত ২৪ ঘণ্টায় এক লাফে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার বেড়ে ২৩ হাজারে পৌঁছেছে। প্রাণহানিও ঘটেছে দ্বিগুণেরও বেশি। এ সেখানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯২ জন।

এরপরই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান। দেশটিতে প্রাণঘাতি ভাইরাসটিতে নতুন করে ১২৯  জনের প্রাণ গেছে। এ নিয়ে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৬৮৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ৬৩৮।

এরপরই ফ্রান্স। ইউরোপের এই দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটেছে ৬৭৪ জনের। আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৮ জনে।

এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্ত-৮ হাজার ৯৬১ জনের বিপরীতে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের, যুক্তরাজ্যে ৫ হাজার ৬৯৩ জন আক্রান্তের মধ্যে মারা গেছেন ২৮১ জন। সুইজারল্যান্ডে আক্রান্ত ৭ হাজারের বেশি নাগরিক, সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন, নেদারল্যান্ডসে ৪ হাজার ২১৬ জনের বিপরীতে মারা গেছেন ১৮০ জন।

এদিকে, প্রাণঘাতি ভাইরাসটির বিস্তার রোধে ভারতজুড়ে চলছে কারফিউ। গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল রোববার শুরু হয়েছে এ জরুরি অবস্থা।

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক এই কারুফিউ সবাইকে মেনে চলতে হচ্ছে। এই সময়ে কাউকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে না যেতে অনুরোধ জানিয়েছেন মোদি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে সোমবার সকাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৩৬০ জনে পৌঁছেছে। মারা গেছেন ৭ জন। এমন অবস্থায় কারফিউয়ে সাড়া দিয়েছে দেশটির নাগরিকরা। রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে চোখে পড়বে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের।

কেউ মারা না গেলেও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে শ্রীলংকায়। সেখানে এখন পর্যন্ত ৮২ জনের দেহে ভাইরাসটির সন্ধান মিলেছে। তাদেরকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। যাদেরে মধ্যে দেশটির কিংবদন্তি ক্রিকেটার সাঙ্গাকারাও রয়েছেন।

ভয়াবহ অবস্থার দিকে হাটছে পাকিস্তান। দেশটিতে নতুন করে প্রায় দ্বিগণ বেড়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। এ নিয়ে সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৭৬ জন। প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন।

প্রকোপ থেমে নেই দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ বাংলাদেশেও। সংখ্যায় কম হলেও প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন আরও একজন। এতে করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২৭। তবে অপরবির্তীত রয়েছে মৃতের সংখ্যা।

করোনার সন্দেহে আইসোলেশনে থাকা এখন পর্যন্ত মোট ৫ জন সুস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

গত এক মাসে বিদেশ থেকে দেড় লাখের বেশি মানুষ দেশে ফিরলেও কোয়ারেন্টাইনে আছেন মাত্র ১৫ হাজারের মতো। এর মধ্যে অনেকে আবার মানছেন না কোয়ারেন্টাইনের শর্ত। ফলে, যেকোনো সময় ভাইরাসটি ব্যাপক বিস্তার করতে পারে।

অন্যদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে বন্ধ করা হয়েছে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিষিদ্ধ করা হয়েছে যেকোনো সমাগম। কয়েকটি জেলায় বন্ধ করা হয়েছে দূরপাল্লার বাস যাতায়াত।

বন্ধ রয়েছে সারাদেশের বার। সমালোচনার মুখে স্থগিত করা হয়েছে চট্টগাম সিটিসহ ২টি আসনের উপ-নির্বাচন। আর সবশেষ রোববার রাতে রাজধানীর সকল সুপারমার্কেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দোকান মালিক সমিতি।

এআই/

কমেন্ট করুন